খাগড়াছড়ি ভ্রমণ ও আঞ্চলিক খাবার Best 23

bangladesh 4690975 640

একাডেমিক চাপে গত কিছুদিন ধরে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলাম,তখন খাগড়াছড়ি…

এরইমধ্যে পরীক্ষা শেষ করে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বন্ধু মিলে দূরে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করতে লাগলাম। ভ্রমণের কথা চিন্তা করলেই প্রথমে পাহাড় অথবা সমুদ্রের কথা মাথায় আসে। তাই আমাদেরও ইচ্ছে হলো উঁচু উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় ঘুরে বেড়ানোর আর খাগড়াছড়ির আঞ্চলিক খাবারের স্বাদ গ্রহণ। সেজন্য বান্দরবানের কেওক্রাডং পাহাড়ে যাওয়ার পরামর্শ দিল বেশ কয়েকজন।

 

এটি বাংলাদেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। তাই এডভেঞ্চারাস ভ্রমণের জন্য আমরা বগালেক ও কেওক্রাডং যাবার সিদ্ধান্ত নেই। তবে সেখানে যেতে ৮-১০ জনের একটি দল হলে সবচেয়ে ভালো। কিন্তু পরিকল্পনার শুরুতে অনেকে যেতে রাজি থাকলেও সর্বশেষ আমরা ছিলাম মাত্র ৪জন। ফলে বান্দরবান ভ্রমণের পরিকল্পনা ভেস্তে গেল।

 

 

তবে আমাদের ভ্রমণে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পাল্টায় নি। আমাদের খাগড়াছড়ির বন্ধু স্বপ্নীলের কাছে পরামর্শ চাইলাম। জানতে চাইলাম, খাগড়াছড়িতে হিল ট্র্যাকিং কেমন? বন্ধু আমাদের উষ্ণ নিমন্ত্রণ জানালেন। শেষ পর্যন্ত চার বন্ধু মিলেই ঢাকা থেকে রওনা দিলাম। গাজীপুরের চন্দ্রা থেকে রাত আটটায় বাস ছাড়লো খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। ব্যস্ত শহরের বুকে পিচঢালা রাস্তায় বাস চলছে সামনের গাড়ির লাল সংকেত মেনে। চলতে চলতে বাস এসে পৌঁছালো কুমিল্লায়।

 

ভ্রমণ বিরতিতে হাল্কা নাস্তা সেরে নিলাম। বাসে উঠে সুপারভাইজারকে খাগড়াছড়ির চেঙ্গী স্কয়ারে নামিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম।

 

রাত শেষে, ভোরে পাহাড়ি রাস্তায় বাস চলছে হেলে-দুলে। দোলতে দোলতে ঘুম ভাঙলো সবার। জানালা দিয়ে ভোরের আলো আসতে শুরু করেছে। চোখ মেলে জানালা দিয়ে তাকাতেই বুঝতে পারলাম আমরা এখন পাহাড়ের চূড়ায়। বাস থেকে পাহাড়ের খাঁদ দেখা যাচ্ছিল। সবুজ চাঁদরে ঢাকা পাহাড়, তার মধ্য দিয়ে আঁকা-বাঁকা পথে বাস চলছে। সবুজ সমাহারের বিশালতা দেখে মন আর মানছিলো না। তাই সম্পূর্ণভাবে জানালা খুলতেই গাছের পাতা থেকে ছিটকে আসা পানি আর হিমেল হাওয়া যেন প্রকৃতির মাঝে আমাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে।

খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক খাবার ও দর্শনীয় স্থান

কিছুক্ষণের মধ্যেই খাগড়াছড়ি জেলার প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করলাম শহরের ভিতর। সকাল সাতটায় আমরা পৌঁছালাম সেই চেঙ্গী স্কয়ারে। বাসা থেকে নামা মাত্রই স্বপ্নীল বন্ধুর দেখা মিললো। বন্ধুর সাথে এবার বুকিং দেওয়া হোটেলের দিকে চললাম। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সেরে আমরা বিশ্রামের জন্য শুয়ে পড়লাম।

 

আরো পড়ুন- ঘুম ছাড়া কি মানুষ বাচঁতে পারে

 

দুপুরে বন্ধুর ডাকে আমাদের ঘুম ভাঙ্গল। স্বপ্নীলদের বাসায় নিমন্ত্রণের কথা ঘুমের মধ্যে ভুলেই গিয়েছিলাম। ঝটপট রেডি হয়ে এবার বন্ধুর বাসার দিকে রওনা হলাম। আধাঘন্টার কম সময়ের মধ্যেই তাদের বাসায় পৌঁছে গেলাম। বাসার সবার সাথে কুশল বিনিময় শেষে নাস্তার জন্য বসলাম। সকালের নাস্তার আয়োজন বেশ।

 

নাস্তায় রয়েছে কলাপাতায় মোড়ানো বিন্নি চালের গুড়ো এবং নারকেল দিয়ে তৈরি পিঠা বেনীহোগা (সরু লম্বাটে ধরনের) ও হলাপিদে (ত্রিকোণাকার) এবং স্থানীয় পাহাড়ী পেপে, কমলা ও আপেল। কলা পাতায় মোড়ানো ভাপে তৈরি এ পিঠা আগে আমাদের কেউ খায়নি; বিন্নি চালের সাথেও পরিচয় এই প্রথম। নতুন এ পিঠা স্বাদ ও ঘন্ধে বেশ, ফলে আমাদের পেটেও চলে গেলো বেশ ভালো পরিমাণেই।

 

নাস্তা পরবর্তী একটু বিশ্রাম ও আলাপের পর আমরা মধ্যহ্নভোঁজের জন্য বসে গেলাম। ডাইনিং টেবিলে বসে আমরা সকলেই অবাক! বাহারি সব আঞ্চলিক খাবারে ডাইনিং টেবিল পরিপূর্ণ। খুব সাধারণ কারণেই বেশিরভাগ খাবারই আমাদের অপরিচিত তবে প্রতিটি খাবারই ঘ্রাণে ও দেখতে বেশ লোভণীয়।

 

খাবারের পদগুলি হচ্ছে- হাত্তল টোন (কাঁচা কাঠালের সাথে চিংড়ি ও ছুড়ি শুটকি দিয়ে তৈরি তরকারি) , সুগুনি হোরবো (ছুড়ি শুটকি পুড়িয়ে পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে তৈরি ভর্তা) , মাজ হেবাং (নানা ধরনের ছোট ছোট দেশি মাছ কলাপাতায় ভাপে রান্না করা তরকারি) , হুরো এ্যরা (মুরগের মাংস) , সবারাং দি পাবদা মাজ (কলাপাতায় ভাপে রান্না করা পাবদা মাছের তরকারি), ডিমভূনা, বাঁধাকপি আর বরবটি সেদ্ধ , সাদা ভাত ও বিন্নি চালের ভাত । সবগুলো পদের খাবার দেখতে যেমন চমৎকার ছিলো স্বাদেও তেমনই অতুলনীয়।

খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক খাবার

খাবারের পর বিশ্রাম শেষে বের হলাম শহর ঘুরার উদ্দেশ্যে। প্রথমেই স্বপ্নীল আমাদের নিয়ে গেল চেঙ্গী নদীর পাড়ে। শীতকাল হওয়ায় নদীতে বেশি পানি ছিল না। তবে যেটুকু ছিল, তা বেশ স্বচ্ছ। নদীর ওপারে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ছোট-ছোট ঘর। পাহাড়ের গায়ে বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ গাছ-গাছালি। নদীর পাড় থেকে তাকালে মনে হয়, প্রকৃতির দেবী নিজ হাতে সবুজ রঙ-তুলি দিয়ে পাহাড়ের আদ্যোপান্তে এক অপরূপ দৃশ্য তৈরী করে রেখেছেন।

 

এই দৃশ্যের অনেকটা সৌন্দর্য্য যেন নদীর স্বচ্ছ জলধারা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাখিরা পাহাড় থেকে নদীতে আবার নদী থেকে সবুজ পাহাড়ে ডুবে যাচ্ছে। এটিই মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বাস্তুসংস্থানিক ঐকতান। শ্রুতিমধুর সুরের ঐকতান শোনার মতো ওই প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে চোখে নেমে এসেছিলো এক প্রশান্তি! হঠাৎ সাইফুর ডেকে বললো, বেশ ক্ষুধা পেয়েছে। স্বপ্নীল সবাইকে ডেকে নিয়ে শহরের পাশ্ববর্তী একটি বাজারের দিকে চললো।

 

এই বাজারে মূলত খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পাহাড়ে আদিবাসিদের চাষ করা তরি-তরকারি ও যাবতীয় সব পণ্য পাওয়া যায়। বাজারে গিয়ে অনেকটা অবাক হলাম। সেখানে বেশিরভাগ দোকানীই নারী। তাদের কাছ থেকেই আবার নারী-পুরুষ সবাই তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করছেন। বাজারে নারী-পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান। সেখানে নারী-পুরুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *